| কবিতা | রবীন্দ্রনাথ কে লেখা একটি অপ্রকাশিত চিঠি |
| কবি | আজিজুল হক |
| লিখার স্থান | কোচবিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ |
| সম্পৃক্ততা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| কবিতার বিষয় | জীবনমুখী, প্রতিবাদ, প্রেম, বিরহ, মৃত্যু, রূপক |
এ চিঠি তোমাকে লিখছি বাবা,
আশা করি আমাকে চিনতে তোমার অসুবিধে হবার কথা নয়,
আমি মাধুরীলতা, তোমার ছোট্ট বেলা!
জান বাবা, খুব মনে পরে যেদিন তুমি, তোমার থেকে নয় বছরের ছোট,
আমার মায়ের চেয়েও বয়সে বড়
তোমার প্রিয় কবি পুত্রের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করলে,
সেদিন, বিশ্বাস কর, আমি রাগ করিনি,
শুধু তোমার উপর করুনা হয়েছিল,
তোমার নারী মুক্তির স্লোগান, কবিতা, গদ্য গুলো আমার সামনে যেন অট্টহাস্যে ফেটে পড়েছিল,
কি করুন ছিল সেই অট্টহাসি,
বিশ্বাস কর, ওরা প্রত্যেকেই আমায় চিৎকার করে বলছিলো,
রবীন্দ্রনাথ তোমার বাবা যত টা,
তার চেয়ে অনেক টা বেশি পুরুষ!
একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন পুরুষ!
পুরুষের আত্মহমিকা তাকেও ঘরে নারী স্বাধীনতার গলা টিপে মেরে ফেলতে উদ্ধত্যতা শিখিয়েছিল,
সত্যি, রবীন্দ্রনাথ!
আমার, আমার মায়ের সেদিন তোমার উপর করুনা হয়েছিল ভীষণ,
সত্যি, ব্রাহ্ম সমাজের মানুষ হয়েও তুমি নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার অধিকার টুকুও দিলে না!
অথচ নিজেই লিখেছিলে
*নারী কে আপন ভাগ্য জয় করিবার…..*
আমি সেই মানুষটি কে কোন দিনও ভালোবাসতে পারিনি বাবা,
তারপর, আমার চোখের সামনে যখন বারবার আমার স্বামীর কাছে তোমাকে অপমানিত হতে দেখেছি,
বিশ্বাস কর, প্রতিবাদ করার সাহস বা মন,কোন টাই আমার ছিল না,
আমি তোমার অপমানের মুহূর্ত গুলো কে তোমার প্রাপ্য বলেই ভেবেছি।
সত্যি, কত দ্বিচারিতা তোমার চরিত্রে!
তোমার অজস্র লিখুনির মাঝে তোমাকে চিনতে আমার ভুল হয়, বাবা!
তারপর, আমার ছোট বোনটিকেও তুমি আমার চেয়েও জ্বালাঞ্জলি দিলে একটা লোভাতুর ভ্রস্ট চরিত্রের ছেলের সঙ্গে অবুঝ বালিকাটির ভবিষৎ জড়িয়ে।
বিশ্বাস কর, ক্ষমা করতে পারিনি তোমায়, বাবা!
আচ্ছা, বাবা, তোমার কি একবারও খারাপ লাগেনি নিজের মেয়েদের প্রতি অবিচার করতে?
যখন ঠাকুর বাড়ির সর্বত্র সংস্কৃতির ছাপ,
যখন বঙ্গ সংস্কৃতি মানেই জোড়াসাঁকো,
তখন তুমি আমাদের হাতে বই তুলে না দিয়ে প্রায় তোমার সমবয়সী পুরুষের হাতে তুলে দিয়েছিলে ভোজ্ঞপণ্যের নৈবেদ্যের মত!
শুধু কি তাই?
যখন গোটা বাংলায় লোকেরা ছেলেদের বিলেত পাঠাতো ব্যারিস্টারি পড়তে,
তখন তুমি রথী কে পাঠিয়েছিলে কৃষি নিয়ে পড়তে!
আসলে অন্তরে জমিদারি সত্তা কে লালন করতে তুমি,
কৃষকের কাছ থেকে বেশি উৎপাদন ও কর আদায়ই তোমার লক্ষ্য ছিল,
সে জন্যই রথীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে তোমার ইচ্ছে পূরণ করার হাতিয়ার তৈরি করাই তোমার জমিদারি সত্তার এক মাত্র উদ্দেশ্য ছিল।
জান, বাবা, আমি যখন ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হলাম,
তুমি আসতে, আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তোমার দিকে তাকিয়ে তোমার নিরবুদ্ধিতাকে পরখ করতাম,
আসলে কিছুই করার ছিল না আমার,
আমার স্বামী তোমাকে সহ্য করতেই পারত না,
তাঁর মনে হত বিয়েতে কুড়ি হাজার টাকা পন না দিয়ে তুমি তাকে ঠকিয়েছিলে।
তুমি সত্যি ঠকিয়েছিলে বাবা, আমাকে, আমার মাকে, আমার ভাই বোন সকলকে।
আমার খুব কষ্ট হয়েছিল বাবা,
যেদিন আমি মরে গেলাম,
তুমি এসেছিলে, কিন্তু বাড়িতে না ঢুকে,
আমার মরা মুখটি না দেখে,
জামাইয়ের হাতে অপমানিত হবার ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে,
আমার সত্যি সেদিন হাসি পেয়েছিল,
কোনোদিন তো আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারোনি তুমি।
সেদিন আমি মুক্ত হয়ে খুব হেসেছিলাম, খুব..
সত্যি, রবীন্দ্রনাথ, তুমি কত অভাগা, নিজের মেয়ের মরা মুখটি দেখার সাহস তোমার হয়নি।
তোমার, রাধা, চন্দ্রারা যদি তোমার আসল রূপ টা জানতো!!!
কিংবা ভিক্টরিয়া,
কি যেন নাম ছিল সেই জাপানি মেয়েটির,
কিংবা তোমার রানু……
এমনি কত… বাবা, আর কত….
আসলে মেয়েদের স্বাধীনতা তোমার কাঙ্খিত ছিল না,
ছিল তোমার নিজস্ব স্বাধীনতার উচ্ছিষ্ট ছিটিয়ে নারী মর্যাদার উলঙ্গ উল্লাসে নিজের মুখ টা ঢাকবার অপপ্রয়াস।
ইতি
বেলা
১৪ই বৈশাখ,…. বঙ্গাব্দ
শ্রীরামপুর