কবিতা শেষ কৈফিয়ৎ
কবি ইমদাদ হাসান ইয়ামিন
সময় ১১.নভেম্বর.২৫, দুপুর
উৎসর্গ রু

রু,

আর কোনোদিন নয়—এই পৃথিবীর আলোয়, তোমার সেই পবিত্র চোখের সামনে আমার ছায়াটিও আর ভেসে উঠবে না। আমার সব বিষাক্ত উচ্চারণ, সব অসম্পূর্ণ বাক্য, আজ চিরতরে নির্বাসিত। আমি যাচ্ছি—এক এমন অতল অন্ধকারে, যেখান থেকে তোমাকে দেখা যাবে কেবল, কিন্তু আমার এক বিন্দু নিঃশ্বাসও তোমায় স্পর্শ করতে পারবে না।

বিশ্বাস চাইবার সাহস আমার নেই, কারণ তোমার বিশ্বাস আমি নিজের হাতে ভেঙেছি—চূর্ণবিচূর্ণ করেছি এক অদৃশ্য অহংকারে। তাই আজ আমি লজ্জার আড়ালে, এক কাপুরুষের মতো লুকিয়ে ফেলেছি নিজেকে। হয়তো একদিন সব ক্ষত শুকিয়ে যাবে, জীবনের রোদ্রপাত আবার ফিরবে—কিন্তু সেই দিনের আলোয় তুমি থাকবে না, তবু আমার প্রতিটি প্রার্থনার পরতে তোমার নামটি জড়িয়ে থাকবে নিঃশব্দে।

তুমি বলেছিলে, “ভালো মানুষ হয়ে ফিরো।” আমি জানি, সেই পথ কত দীর্ঘ, কত দহনময়। তবু আমি প্রতিজ্ঞা করছি—যদি কোনো একদিন এই নরক থেকে মুক্তি পাই, আমি তোমার সামনে দাঁড়াবো—ভালো মানুষ হয়ে, তোমার চোখে আলো হয়ে। কিন্তু যাওয়ার আগে একবার, শুধু একবার বলো—তুমি কি থাকবে আমার সাথে, কোনো এক অনন্তে, কোনো এক নীরব আকাশে?

আমি জানি, তোমার উত্তর আসবে না। তবু আমার সব মিথ্যার ভেতর আজ যে নির্মম সত্যটা জেগে উঠেছে, সেটাই আমার একমাত্র দহন। রু, তুমি শান্ত থেকো। আমি দূরে থাকবো, তুমি ভালো থেকো।

তবু একটি অসহ্য ব্যথা, এক কাঁটার মতো থেকে যাবে আমার ভিতরে—যে মুহূর্তে তুমি আমার হাত ছেড়ে চলে গেলে, সেই মুহূর্তটা আজও আমার বুকের ভেতর ছাই হয়ে পুড়ছে। আমি কারো কাছে ভালোবাসা ভিক্ষা চাইনি, কেবল তোমার কাছে আশ্রয় চেয়েছিলাম—একটু মমতা, একটুখানি আলো। তুমি মুখ ফিরিয়ে নিলে। তোমার সেই নীরব প্রত্যাখ্যান আজও আমার হৃদয়ের ভেতর রক্তক্ষরণ ঘটায়।

আজ আমার কণ্ঠনালী শুকিয়ে এসেছে কান্নায়, অথচ চোখে একফোঁটা জল নেই—শুধু আগুনের মতো রক্ত ঝরছে নীরবে। আমাকে আর কেউ গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াবে না, কেউ আর সেই প্রিয় “চর্কি” গেয়ে জড়িয়ে ধরবে না। তাই শেষবারের মতো, এক অশ্রুহীন অন্ধকার থেকে বলছি—আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি।

তুমি ছিলে আমার রুবিতা, আমার কবিতা, আমার চিরস্থায়ী উপমা।

তুমি বলেছিলে—আমি নীরব, নির্লিপ্ত, উদাস। দেখো, আজ সেই উদাস ছেলেটিই তোমার কাছে প্রার্থনা করছে—একবার করুণা করো। যত যন্ত্রণা তোমায় দিয়েছি, আজ তার হাজারগুণ দহন আমার ভেতরে জ্বলছে। আমাকে সেই শাস্তি পেতে দাও, পেতে পেতে নিঃশেষ হতে দাও। তবু তুমি ভালো থেকো, সুস্থ থেকো।

তুমি ভুলে যেও, আমি কোনোদিন ভুলবো না। আমার এই শূন্য হাতটি আজও তোমার জন্য প্রসারিত। হয়তো কোনো একদিন, কোনো এক অনির্দিষ্ট সন্ধ্যায়—তুমি যদি ধরতে চাও, এসো, আমি থাকবো।

জানো রু, তোমার সেই সাতাশ পৃষ্ঠার চিঠির উত্তর আমি লিখেছিলাম—২৫ নভেম্বর তোমার হাতে দেব বলে। কিন্তু তুমি আর আমাকেই চাওনি। সেই চিঠি আজও পড়ে আছে, অক্ষরে অক্ষরে শুকিয়ে যাওয়া বকুলফুলের মতো। তুমি চলে গেলে নীরবে, শব্দহীন বিদায়ের মতো। কেন? আমি তো কেবল তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম—অসীম সত্যের মতো, নিজের ভুল নিয়েও নিঃশেষ ভালোবেসেছিলাম।

হয়তো আমাদের দেখা হবে আবার—কোনো বসন্তবিহীন বসন্তে, কোনো জন্মে যেখানে ঘৃণা থাকবে না, থাকবে শুধু নীরব আলো।

তবু সবচেয়ে বড় ভয়টা এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়—তুমি যদি আমায় আবার দেখো, হয়তো তোমার চোখে ঘৃণা জেগে উঠবে। আর আমি ভয় পাই, রু—ভয় পাই তোমার ভয়কে।

এই চিঠিটাই হয়তো আমার শেষ চিঠি। আমি তোমার স্বপ্নের পথ থেকে সরে যাচ্ছি। তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করো। আমায় ঘৃণা করো, কিন্তু দয়া করে ভয় পেয়ো না। যদি কখনো সময় পেয়ে মনে পড়ে, গানের কোনো সুরে আমায় আবার ডেকে নিও—আমি বাতাস হয়ে ছুঁয়ে যাবো তোমার চারপাশ।

যেখানেই থাকি, বিশ্বাস করো, আমার অক্ষয় আশীর্বাদের আচ্ছাদন তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্ত থাকো, আলোকিত থেকো—এই আমার শেষ, আর একমাত্র প্রার্থনা।

আমাকে যত মন্দ ভেবেছ, আমি ততটা মন্দ নই—এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ।

ইতি,
তোমার একান্তই,
কাব্য / রোদ (অবিশ্বাস)

guest
0 Comments
Newest
Oldest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments