| কবিতা | স্বভাবের অন্ধকার— |
| কবি | নাইমুর রহমান |
| কাব্যগ্রন্থ | মহাকালের কাব্য |
| সময় | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ০৯ঃ০৬ মিনিট |
| উৎসর্গ | “বিশ্বাসের আড়ালে যে অচেনা” |
| লিখার স্থান | ঢাকা সেনানিবাস, ঢাকা ,বাংলাদেশ |
| সম্পৃক্ততা | পরিচিত এক মুখের অচেনা অধ্যায়। |
| কবিতার বিষয় | মৃত্যু |
স্বভাবের অন্ধকার
পতিতাকে আমি দেখেছি—
তারও একটি গল্প থাকে,
কখনো অভাবের কাছে হেরে যাওয়া,
কখনো ভুল মানুষের হাতে বিকিয়ে যাওয়া জীবন,
কখনো সমাজের ছুড়ে দেওয়া এক নাম—
যে নামের আড়ালে
একজন মানুষ নীরবে বেঁচে থাকে।
তাকে যদি একদিন
পতিতালয়ের অন্ধকার থেকে তুলে আনা যায়,
যদি তার হাতের মুঠোয়
একটু বিশ্বাস রাখা যায়,
যদি বলা যায়—
“এসো, এবার থেকে তুমি আমার ঘরের মানুষ,”
তবে হয়তো সে-ও
সন্ধ্যায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে
একজন মানুষের অপেক্ষা করতে শিখবে।
কারণ শরীরের অতীত
সবসময় চরিত্রের ভবিষ্যৎ নয়।
কিন্তু স্বভাবের পতন— সে অন্য জিনিস।
যে মানুষটি
একই ঘরে বসে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে
ভালোবাসার কথা বলে,
আর দরজা পেরোলেই
অন্য কারও বাহুতে নিজের রাত রেখে আসে—
তার শরীরের চেয়ে
তার অভ্যাসটাই বেশি নগ্ন।
যে আমার হাত ধরে
অন্যের হাতের উষ্ণতা লুকিয়ে রাখে,
যে আমার কাছে বিশ্বস্ততার অভিনয় করে
আর অন্যের কাছে
আমার অস্তিত্বটুকুও অস্বীকার করে—
তাকে আমি কী নামে ডাকব?
পতিতা?
না।
পতিতারও তো
একটি নির্দিষ্ট অন্ধকার থাকে;
স্বভাবের পতনের কোনো পতিতালয় নেই—
সে ঘরেই থাকে,
বিছানাতেই থাকে,
হাসির ভেতর থাকে,
ভালোবাসার ভাষাতেও থাকে।
সবচেয়ে ভয়ংকর পতন
তখনই ঘটে,
যখন একজন মানুষ
পাপের জন্য লজ্জিত হয় না,
বরং তাকে স্বভাব বলে মেনে নেয়।
তখন তাকে ঘরে আনা যায়,
কিন্তু সংসারে নয়।
এক ছাদের নিচে থাকা যায়,
কিন্তু এক বিশ্বাসের নিচে নয়।
এক বিছানায় শোয়া যায়,
কিন্তু একই স্বপ্নে নয়।
কারণ সংসার তো শুধু
দুটি মানুষের পাশাপাশি ঘুমিয়ে পড়ার নাম নয়—
সংসার হলো—
রাত গভীর হলে
,
দুজনেরই জানা থাকে,
এই মানুষটি আমার;
এবং আমি তার কাছে নিরাপদ।
অথচ কিছু মানুষ
সংসারে থেকেও সংসার করে না।
তারা একজনের ঘরে থাকে,
অন্যের স্মৃতিতে ঘোরে,
আর তৃতীয় কারও বিছানায়
নিজের বিশ্বস্ততাকে কবর দেয়।
আমরা পতিতাকে চিনি— কারণ তার পরিচয় প্রকাশ্য।
কিন্তু স্বভাবের পতিতাকে
চেনা বড় কঠিন।
সে হয়তো খুব ভদ্র,
খুব সুন্দর কথা বলে,
তোমার জন্মদিন মনে রাখে,
তোমার অসুস্থতায় পাশে বসে,
তোমার কপালে হাত রাখে—
তারপরও তোমার অনুপস্থিতিতে
তোমার ভালোবাসার শরীরটুকু
অন্যের কাছে বিলিয়ে দেয়।
তাই তো আজকাল ভাবি—
আমি পতিতাকে ঘৃণা করতে শিখিনি,
আমি ঘৃণা করি প্রতারণাকে।
কারণ পতিতালয় থেকে
কাউকে ফিরিয়ে আনা যায়;
কিন্তু যে নিজের ভেতরেই
পতনের জন্য একটি ঘর বানিয়ে ফেলেছে,
তাকে কোথায় ফিরিয়ে আনবে?
তার তো ফেরার কোনো ঠিকানা নেই।
সে তোমার ঘরেই আছে— শুধু তোমার নয়।
আর সবচেয়ে বড় দুঃখ জানো?
অনেক মানুষ এমন একজনকে
সারা জীবন ভালোবেসে যায়,
যার স্বভাব সে কোনোদিন চিনতেই পারেনি।
ভেবেছে— “সে আমার।”
অথচ সত্যিটা ছিল—
সে কারও ছিল না;
সে শুধু
যার কাছে মুহূর্তটুকু সুন্দর,
তারই হয়ে থেকেছে।
আর তুমি?
তুমি শুধু
—
ভালোবাসার নামে
,
তার স্বভাবকে
,
বিশ্বস্ততা ভেবে বসেছিলে।
সংসার ভাঙে সবসময় তৃতীয় মানুষের জন্য নয়—
কখনো কখনো ভাঙে
একজন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা
অসংখ্য মানুষের কারণে।
(নাইমুর রহমান )
কল্পনার জগতের গল্পকার-