| কবিতা | নিঃসঙ্গ নীরবতা |
| কবি | সুজিত কুমার ভৌমিক |
| কাব্যগ্রন্থ | যন্ত্রনা |
| সময় | ২০২৩ |
| উৎসর্গ | সবিতা ভৌমিক |
| লিখার স্থান | চন্ডীপুর |
| সম্পৃক্ততা | যন্ত্রনা |
নিঃসঙ্গ নীরবতা
**************
সুজিত কুমার ভৌমিক
টক কুলের গাছটি এদিক ওদিক,
তাকিয়ে দেখল শিশুদের দল আসছে কিনা,
কেউ আঁকশি দিয়ে কুল পাড়বে,
কেউ ঢিল ছুড়ে, কেউবা তার ডালের
উপরে উঠে কুল পাড়ার চেষ্টা করবে।
কিন্তু শিশুদের কি হয়েছে বলত আম দিদি?
আম গাছটি মগ ডাল দিয়ে উঁকি মেরে দেখলো
কিছু শিশু বন্দী হয়ে পড়ছে,
কিছু শিশু শ্রমিক হয়ে মুখ বুজে কাজ করছে।
কেউ বা আবার আসক্ত হয়ে পড়েছে কোন
বোকা যন্ত্রে, যাকে বলে মোবাইল।
দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে বলল–“এক সময় এমন
ছিল ঝড় হলেই আমার গাছের নিচে
এসে হা হা করত শিশুর দল।
ডাল নাড়িয়ে আম পেকেছে কিনা দেখতো।
এখন সমস্ত ফলগুলো পেড়ে নিয়ে চলে যায়
কোন এক মোটা গোঁফেল ব্যবসায়ী,
শিশুরা আর পায় না।
কথাগুলো শুনতে পেয়ে লতাপাতার আড়ালে
ঢাকা হয়ে থাকা কালোজামের গাছটি বলে উঠল -“ঠিক বলেছিস রে আম বোন ,
একসময় ছিল জাম কুল খাওয়ার জন্য লবণ নিয়ে সবাই গাছের নিচে আসতো।
কুল খেতো এমন ভাবে যে সবার জীভগুলো
নীলাভ কালো হয়ে যেত,
আনন্দে পরিবেশটা মুখরিত হত।
কিন্তু এখন শিশুরা কোথায়?
“ওদের শৈশব হারিয়ে গেছে”
-মিষ্টি পেয়ারা গাছটি বলে উঠল।
“না কি বলতো সবেদা দিদি?”
সবেদা গাছটা উঁকি মেরে বলল–
“ওরা তো তবু তোদের গাছের নিচে থাকত,
কিন্তু আমার প্রত্যেকটা ডালে সেই সকাল থেকে
থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে দোলা খেত,
আমার প্রায় পেকে আসা ফলগুলো খেয়ে মুখ দিয়ে তাদের সাদা আঁঠা বেরিয়ে আসত।
কি আনন্দে মুখরিত হতো সব কিছু।
এখন কিচ্ছু নেই রে,
মহাশূন্য শ্মশানের নীরবতা।
ওই দ্যাখ ওই একটা শিশুকে দ্যাখ
বন্দী করে তার মা বাবা মারছে,
ও মোবাইল নিয়ে খেলতে চায়।
শিশুটি মোবাইল দেখতে চায়।
তাকে জোর করে পড়াতে বসিয়ে রেখেছে।
এর শেষ কোথায়?
“এক গভীর অন্ধকার”-
উত্তর দিল খেজুর গাছ।
মনের দুঃখে বলল —
“আমার খেজুর কুলগুলো আর কেউ পাড়ে না। আঁকশি দিয়ে নাড়া দিয়ে কেউ বলে না–
” একটি বড় পাকা খেজুর কুল!
কত বড়! কী পাকা!”
কুলগুলো সব পড়ে পড়ে নষ্ট হয়। ”
সবাই দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সমস্বরে বলতে লাগল-
“একদিন এমন আসবে,
শিশুরা যন্ত্রে পরিনত হবে।
শিশুদের শৈশব অপরিণত হয়ে যাবে,
পঙ্গু হয়ে যাবে।
কেউ কারোর সাথে কোন কথা বলবে না।
সমানুভূতি থাকবে না,
ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া,মমতা,সাহায্য করা
সব উবে যাবে কর্পূরের মতো।
শুধু যান্ত্রিক বাক্সে পরিণত হবে শিশুরা।
শুকনো শুষ্ক খটখটে মরীচিকা।
এক ভয়ংকর নিঃসঙ্গ নীরবতা।