| কবিতা | ইন লাভিং মেমোরি অব টিঙ্কার বেল |
| কবি | মার্সেলিন কুইয়া |
| সময় | ১১ এপ্রিল, ২০২০ |
| কবিতার বিষয় | জীবনমুখী, বিরহ, সমসাময়িক |
আমি সুহাসিনীকে চিনতাম না।
অবশ্য, সুহাসিনী আমায় চিনতো। আমি জানতাম, সুহাসিনী কবিতা ভালোবাসতো!
সুহাসিনী!
অবশ্য, বাসায় নাকি সবাই তাকে তিথু বলেই ডাকতো। সুহাসিনী আমায় ভালোবাসতো।
সুহাসিনী আমায় প্রথম যে রাতে "ভালোবাসি" বললো- আমি সেরাতে ব্যস্ত;
উত্তর দেওয়ার সময় আমার ছিলো না।
অবশ্য, তখন আমি তাকে সুহাসিনী ডাকতাম না।
সুহাসিনী আমায় ডেকে বলেছিল,
"কবি,
যদি সম্ভব হয়। একবার বলুন, "ভালোবাসি।" আমি কথা দিচ্ছি, সব ছেড়ে চলে আসব আপনার কাছে। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র-ধর্ম সব!!! পৃথিবীর সব বাঁধন ছেড়ে আমি ছুটে আসব। আমি আপনাকে ভালোবাসি।"
আমি উত্তরে হেসে বলেছিলাম,
"অনু ছাড়া আমি কাউকেই ভালোবাসতে জানিনা..."
সুহাসিনী'কে নিয়ে আমার কবিতা লেখার কথা ছিল!
যাকে দেখিনি কখনো-
শুধু তিন ঘন্টা কথা বলে কি কাউকে নিয়ে কবিতা লেখা যায়!
আমি কথা রাখিনি।
সুহাসিনী সাথে আমার দ্বিতীয় কথা হয় আজ সকালে।
এক বৎসর পর!
সুহাসিনী আমায় তীব্র ভর্ৎসনা করে বলেছিল- আঙ্গুল উঁচিয়ে বলেছিল,
"আপনি আমায় ভুলে গ্যাছেন!"
আসলেই!!!
"তিথু নামের কাউকেই আমি চিনিনা।"
কে সুহাসিনী?
সুহাসিনী জন্মাবধি টেক্সাসে থাকতো!
সে স্বর্ণকেশী ছিলো কিনা আমি জানিনা;
সে চোখে কাজল পড়তো কিনা আমি দেখিনি-
আমি শুধু জানি,
তিথু!!!
সেই মেয়েটা যে আমায় ভালোবাসতো!
আমি "সুহাসিনী" কে নিয়ে প্রথম কবিতাটি লিখে ফেলেছিলাম সকালেই!
লিখেই বললাম,
"আজ থেকে তোমার নাম 'সুহাসিনী'!!!"
সুহাসিনী খুশি হয়ে বলেছিল,
"আপনি আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?"
আমি বললাম,
"রাখবো!!!"
"আমার বারান্দায় সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দুই-ই দেখা যায়। আসবেন? চা খেয়ে যাবেন? হিউস্টন স্টারবার্ক্স নয়; আমার বাসার চা।।মা আপনাকে দেখলে খুশি হবে খুব। প্যারিস যাওয়ার পথেই না হয় বিশ্রাম করে যাবেন!"
আমি বললাম,
"আসবো।"
সুহাসিনী কি বুঝলো জানিনা। আমায় বললো,
"আমি মারা গেলে আমার সেক্রেটারি আপনার সাথে যোগাযোগ করবে। আবার এক বৎসর পর বেঁচে থাকলে কথা হবে।"
আমি উত্তরে দিয়েছিলাম,
"বিদায় সুহাসিনী, অপেক্ষায় থেকো..."
এরপর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলো।
চৈত্রের রোদ বিদায় নিল হঠাৎ!!!
তারপর হঠাৎ,
পেলাম দুটি ম্যাসেজ!!!
একসাথেই!!!
"Hello Sir,
This is Courtney. I am the assistant of Miss "সুহাসিনী' She has passed away today 11.4.2020 at 6am in isolation at her residence. She was diagnosed with Covid-19 positive on 12th March. She had previous history of asthmatic attack. She was under medical supervision. Her previous id is deactivated. I've been asked to deliver this message to you and delete this id forever without giving any further information. She has told me to give this message on her behalf. Thank you."
আমি থমকে গেলাম!!!
"প্রিয় কবি,
আশা করি ভালো আছেন৷ আজ প্রায় একবছর পর লিখছি৷ আপনার কথা খুব মনে পড়ছিল৷ খুব কষ্ট হচ্ছিল৷ তাই গতকাল ম্যাসেজ দিয়েছিলাম৷ ভেবেছিলাম এসব দেখে আপনি রেগে যাবেন৷ কিন্তু আপনি রাগেন নি৷ ঠান্ডা মাথায় সব কথা শুনেছেন৷ ভেবেছিলাম আর কখনো কড়া নাড়বোনা৷ কিন্তু সময় যে খুব কম৷ তাই ভাবলাম দেরী আর না করি৷ ছোটকাল থেকেই asthma ছিল৷ কিন্তু আজকাল নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়৷ মনে হয় আমার ফুসফুসে ছোট ছোট অনেকগুলো ফুটো হয়ে গেছে৷ It just cannot contain enough air. যতোই চেষ্টা করি বার বার হেরে যাই৷ অক্সিজেনের গুরুত্ব এখন বুঝতে পারছি৷ এতোদিন বুঝিনি৷ We do not realise the blessings around us until we face a tough situation. এতো এতো medicine কিছুই শরীরে react করছেনা৷ আর কতো? আমি হয়তো মারা যাবো৷ এই সময়টাতে আমি যাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি তাদের কথা খুব মনে পড়ছে৷ আপনিও তাদের মধ্যে একজন৷ আপনাকে চায়ের জন্য ইনভাইট করেছি৷ আপনি গ্রহণ করেছেন এতেই আমি অনেক খুশি৷ আপনি ঠিকানা খুঁজছিলেন কিন্তু দিতে পারিনি। কারণ আমি জানিনা Where I will reside. Is it heaven or hell? জানিনা৷ তবে আমার শেষ সময়কার সবচেয়ে সুন্দর উপহারটি দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ৷ আমি কল্পনাও করিনি আমার জন্য কেউ এতো সুন্দর, নিখুঁতভাবে কিছু লিখবে৷ এতো সুন্দর একটা নাম পাবো এটাও ভাবিনি৷ না চাইতেই আমরা অনেক কিছু পেয়ে যাই৷ এর মধ্যে একটা প্রচন্ড সাহসের কাজ করে ফেললাম৷ বলে দিলাম ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি৷ চেয়েছিলাম কখনো না বলতে কিন্তু না বলে গেলে একটা ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে যেতো৷ আমি বুঝেছি সময় থাকতেই ভালোবাসি বলে দিতে হয়৷ অনুভূতি প্রকাশ না করলে সেটা হারিয়ে যায়৷ আমিও তো হারিয়ে যাবো কিন্তু এখন আর আমার ভয় বা আফসোস কোনোটাই লাগছেনা৷ এখন আমার ইচ্ছে করছে আপনার হাত ধরে একটু শুয়ে থাকতে৷ I have no intention to contaminate you. এম্নিতেই৷ এর উপর আবার চুমুর দাবী!! আপনি হ্যাঁ/ না কিছুই বলেননি৷ আমি জানি অনু থাকতে আপনি কখনোই হ্যাঁ বলবেন না৷ এবং আমি চাইনা আমার জন্য আপনি এমন কিছু করুন যাতে আপনার এবং অনুর মাঝে দূরত্ব বাড়ে৷ আপনারা সবসময় ভালো থাকুন৷ সাথে থাকুন৷ অনুর প্রতি আপনার ভালোবাসা দিয়ে লেখাগুলো পড়েই তো আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম কবি৷ দুটো বই বেরিয়েছে আপনার। কাজিনকে বলেছিলাম আমার জন্য কিনে রাখতে৷ কিনেছে সে৷ শুধু হাতে পেলাম না৷ দূরত্বটা একটু বেশিই হয়ে গেলো... তাই না? আমার পরিচয় আর দেওয়া হলোনা৷ যেভাবে এসেছি সেভাবেই হারিয়ে যাবো। আচ্ছা আমাকে কি ভুলে যাবেন? না। আর মনে হয় পারবোনা৷ সব ঝাপসা হয়ে আসছে৷ আমি হারিয়ে যাচ্ছি অন্ধকারে। আমি নিশ্বাস নিতে চেয়েও পারিনা৷ আর কিছু মাথায় আসছেনা৷ আমি ঘুমাবো৷ অনেক অনেক রাত ঘুমাই না৷ ঘুমোতে হবে কবি৷ তবে আপনি ঘুমাবেন না৷ হারিয়ে যাবেন না৷ আপনি ভালো থাকবেন৷ বেঁচে থাকবেন৷ লিখে যাবেন৷
আপনাকে শ্রদ্ধা করি৷ ভালোবাসি৷
ইতি,
সুহাসিনী৷
যদি এই মৃত্যুশয্যায় তোমার হাত শক্ত করে ধরে রাখতে পারা যেতো!"
আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম জানলার বাইরে। একটা বেলুম্বগাছ। আকাশ।
একই আকাশ টেক্সাসেও!
আমি ছাদে....
পূর্বদিকের আকাশে একটা তারা ভয়াবহ উজ্জ্বল!!!
সুহাসিনী!!!
অথচ, আমরা বেঁচে থাকলে একই আকাশের ছাদের নিচে বসে চা খেতে পারতাম!
আকাশটা ধূসর!!!
নাকি বেগুনী-
আকাশের আসলে কোন রঙ নেই।
তবে, পুব আকাশের "সুহাসিনী" নামের তারাটি বেশ উজ্জ্বল!!!
