কবিতা অরণ্যমন
কবি সিতাপ পাল
সময় জুলাই, ২০২৩
লিখার স্থান হবিগঞ্জ
কবিতার বিষয় প্রকৃতি
Review This Poem

শিরদাঁড়া বাঁকিয়ে যেখানে তালগাছেরা দাঁড়িয়ে
সেখানে এক বিকেলবেলা উড়েছিল সাদা বকের ঝাঁক।
সেদিন চারপাশে বয়েছিল কিছু শুষ্ক হাওয়া
করমচার বনে, ধানক্ষেতের সনে— দুলেছিল অসংখ্য কাশফুল।
জানান দিয়েছিল আশ্বিনের, দেবীপক্ষ বহমান।
শরতের নীলাকাশে শুভ্র মেঘের দল খেলা করে
অনন্ত সেই জীবনের সৌম্য গহীন অরণ্যে হেঁটেছিলাম একা
অনন্তকাল হাওরের বুকে চোখ ফেরালে দেখেছিলাম
মাঝিদের হৃদয়ক্ষত আর কিছু ব্যবচ্ছেদ;
সেখান থেকে কিছু দূরে কান পেতে শুনেছিলাম
উড়ন্ত মুনিয়ার চিৎকার।
অভয়ারণ্যে মশাল হাতে বেরিয়েছে যারা
তাদের উত্তপ্ত হাতিয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক বাসস্থান
মৌয়ের চাক ভেঙে তাজা রক্তের মতো বেয়ে পড়ে তরল
মৌমাছির ভনভন শব্দ আর্তনাদের মতো মস্তিষ্কে বেজে ওঠে।
এইসব চিৎকার, এইসব আর্তনাদ যেদিন পাল্টে যাবে মহালয়ার সুরে, সেদিন হয়তো কোনো এক
উজ্জ্বল নক্ষত্রের দেখা পাব আমি এবং আমরা।
সেদিন দেখব সবুজ মাঠের উপর দেবীর পায়ের ছাপ
সাদা শাড়ির লাল পাড়ের স্রোত বয়ে যায় ঘাসে,
নারী মূর্তি সাংকেতিক বার্তার মতো খোঁপার বাঁধন খুলে দিয়ে যায়
চোখে তার ভোরের নরম শিউলি ফুল ফুটে ওঠে।

পুণর্জন্মে আবারও যদি হেঁটে বেড়াই অনন্ত অম্বরে একা—
এই অরণ্য, এই নদ, এই নীলাকাশ, এই শরৎ-হেমন্ত
কিংবা ধরিত্রীর গায়ে যদি ফিরে আসি একদিন
হয়তো দেখব দোদুল্যমান মধ্য দুপুরের কচিপাতার খেলা
দেখব এক রূপোলি মরুভূমির প্রান্তরে অস্তগামী গোধূলি
দেখব সুজন মাঝির বেয়ে চলা নাও, দূরে গাঙচিল
সাক্ষী হতে হবে নারকেল গাছের প্রৌঢ়ত্বের।
সকাল-সন্ধ্যে শঙ্খের ধ্বনি বেজে উঠে যে ঘরে, দেখব
সেই ঘরের ভাঙা দরজায় ঈশ্বর উঁকি দিয়ে যায়
বদলে যায় ঘর ও দুয়ারের ভাগ্য; বদলায় পৃথিবীর রঙ।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক মেঠোপথে দেখব রাজহাঁসের সারি
দেখা হয়ে যাবে দেবীর পদধূলি মাখা সেই ঘাস
অন্তরিক্ষের গায়ে ভেসে বেড়ায় সাতরঙা ইন্দ্রচাপ
দেখব কামরাঙা বন, বৃষ্টিভেজা কচুক্ষেত। সব আছে, শুধু
যে উড়ন্ত মুনিয়ার বুকে গেঁথেছিল এক বিদেশি বুলেট
যে মৌয়ের চাকে বয়েছিল খয়েরি রঙের লোহিত কণা
তাদের সাথে সহস্রকাল আর হবে না দেখা!

guest
0 Comments
Newest
Oldest Most Voted