| কবিতা | শেষ বেঞ্চের দুজন ( শ্রুতি নাটক ) |
| কবি | আজিজুল হক |
| সময় | 18/10/26 |
| উৎসর্গ | মাধবীলতা কে |
| লিখার স্থান | কোচবিহার |
| সম্পৃক্ততা | প্রেম - বিরহ |
| কবিতার বিষয় | জীবনমুখী, প্রেম, বিরহ |
চরিত্র:—–
সুব্রত — স্কুলশিক্ষক, স্বামী (মানসিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত)
অপর্ণা — স্কুলশিক্ষিকা, স্ত্রী (অভিমানী ও সন্দিহান)
অরিন্দম — সহকর্মী (নেপথ্যের কণ্ঠ / যার ছায়া দুজনের সম্পর্কে সন্দেহের ঝড় তোলে)
তুলি — তাদের ছোট মেয়ে (নেপথ্যে)
দৃশ্য ১
(রাতের দৃশ্য। দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ। বাইরে ঝিঁঝি পোকার ডাক। ঘরের দরজা খোলার ভারী শব্দ। সুব্রত ঘরে ঢোকে। অপর্ণা সোফায় বা বিছানার এক প্রান্তে পাথরের মতো বসে থাকে। বাতাসে চরম একটা অদৃশ্য দূরত্ব।)
সুব্রত: অপু… অপু..অপর্ণা…
অপর্ণা: (শীতল গলায়) হুম।
সুব্রত: ঘুমাওনি কেন এখনো? এত রাত হয়েছে!
অপর্ণা: ঘুম আসার মতো পরিস্থিতি কি রেখেছ তুমি? প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে রাত ফুরিয়ে আসে।
(একটু দীর্ঘ নীরবতা। ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ আরও চওড়া হয়।)
সুব্রত: আজ… আজ একটু বেশি দেরি হয়ে গেল স্কুলে। অফিশিয়াল কাজ ছিল।
অপর্ণা: (একবার বাঁকা চোখে তাকিয়ে) বুঝেছি। কোনো অসুবিধে নেই। স্কুলের কাজ তো আর শেষ হয় না! বিশেষ করে আজকাল তো স্কুলের বাইরেও কত কীসের কাজ থাকে… তাই না?
সুব্রত: (ভুরু কুঁচকে) মানে? কী বলতে চাইছো তুমি? স্পষ্ট করে বলো।
অপর্ণা: কই, কিছু না তো! এমনিই বললাম।
সুব্রত: এই “কিছু না” কথাটা তুমি আজকাল খুব বেশি ব্যবহার করো, অপর্ণা। অসহ্য লাগে!
অপর্ণা: আর তুমি ব্যবহার করো “স্কুলে কাজ ছিল” কথাটা। ওটা কি তোমার জন্মগত অধিকার নাকি আলিবাবার জাদুমন্ত্র? যখনই চাও, তখনই পর্দা টেনে দাও!
(ঘরে উত্তাপ বাড়তে থাকে। সুব্রত চেয়ারটা সজোরে টেনে বসে।)
সুব্রত: আবার শুরু করলে? রোজ রোজ এই সাইকোলজিক্যাল টর্চার ভাল লাগে না আমার!
অপর্ণা: আমি শুরু করি? সব দোষ আমার?
সুব্রত: হ্যাঁ, তুমিই করছ! অকারণে সন্দেহ করছ, দম বন্ধ করে রাখছ এই বাড়িটার বাতাস!
অপর্ণা: ঠিক আছে। আজ থেকে আর কোনো অভিযোগ করব না।কিচ্ছুঁও না। কিচ্ছু শুরু করব না!
(চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর শব্দ। পায়ের চপচপ আওয়াজ।)
সুব্রত: কোথায় যাচ্ছ এখন আবার মাঝরাতে?
অপর্ণা: প্রতিদিন যেমন যাই, অন্য ঘরে। যে ঘরে একা থাকা যায়।
সুব্রত: কেন? এই ঘরটা কিসের?
অপর্ণা: এই ঘরে এখন দুটো শরীর থাকে, দুটো ছায়া থাকে… কিন্তু কোনো মানুষ থাকে না,
সুব্রত! শুধু একটা অদৃশ্য দেওয়াল থাকে মাঝখানে।
(ধড়াস করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। সুব্রত একা হাঁপাতে থাকে।)
দৃশ্য ২
(সকাল। ভোরের আলো। রান্নাঘরে কাপ-প্লেটের টুংটাং শব্দ। সুব্রত বারান্দায় দাঁড়িয়ে অস্থির পায়ে হাঁটে।)
তুলি (নেপথ্য থেকে): মা, বাবা কি আজও ওই আলাদা ঘরে ঘুমিয়েছিল?
(কাপ রাখার কড়া শব্দ।)
অপর্ণা: তোর অত মাথা ঘামাতে হবে কেন রে? যা, গিয়ে স্কুল ড্রেস পর। এসব বড়দের ব্যাপার নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না!
দৃশ্য ৩
(স্কুলের করিডোর। ছাত্রছাত্রীদের দূরবর্তী গুঞ্জন। টিফিন পিরিয়ডের ঘণ্টা বাজে।)
অরিন্দম (নেপথ্য বা দূর থেকে): সুব্রতদা! একটু শুনবেন?
সুব্রত: বলো অরিন্দম।
অরিন্দম: কাল ক্লাসের পর একটু বসবেন প্লিজ? একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কথা ছিল। আপনাদের ডিপার্টমেন্ট নিয়ে একটু কানাঘুষো চলছে তো… তাই ভাবলাম আপনাকে জানাই।
সুব্রত: (থমকে গিয়ে) কীসের কানাঘুষো? অপর্ণাকে নিয়ে কিছু?
অরিন্দম: না মানে… ঠিক সরাসরি বলতে পারছি না। তবে কাল বিকেলে অপর্ণা ম্যাডামকে স্কুল গেটের বাইরে এক অপরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা দেখলাম। ওনার মুখটা বেশ অন্যরকম লাগছিল… কেমন যেন একটা ব্যাকুলতা! ভাবলাম আপনি হয়তো জানেন।
সুব্রত: (ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে, গলায় কাঠিন্য এনে) এসব রিউমার ছড়িয়ো না, অরিন্দম। অপর্ণা অন্যরকম নয়।
অরিন্দম: আমি তো জাস্ট দেখলাম তাই বললাম দাদা! ঘরের মানুষ তো অনেক সময় অনেক কিছু টের পায় না। সাবধানে থেকো।
(অরিন্দমের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায়। সুব্রত স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তৃতীয় ব্যক্তির অদৃশ্য ছায়া তাদের মাঝখানে আরও দীর্ঘ হয়।)
দৃশ্য ৪
(রাতের বেলা। নিস্তব্ধ ঘর। সুব্রতের পকেটে থাকা ফোনটা হঠাৎ বেজে ওঠে। স্ক্রিন লাইট জ্বলে ওঠে। সুব্রত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল আসছে। সে ফোনটা কেটে দেয়। অপর্ণা দূরে দাঁড়িয়ে তা লক্ষ্য করে।)
অপর্ণা: ফোনটা তুললে না যে? খুব জরুরি কল মনে হচ্ছিল! কোনো বিশেষ মানুষ বুঝি? যাকে দিনের আলোয় কথা বলা যায় না?
সুব্রত: (বিস্ফোরিত চোখে) অপর্ণা! তোমার এই পিত্তি জ্বালানো কথাগুলো বন্ধ করো বলছি! কে ফোন করেছে না করেছে তাতে তোমার কী?
অপর্ণা: আমার কিছু যায় আসে না! কিচ্ছু না! কিন্তু যখন দেখি আমার চোখের সামনে একটা মানুষ আস্তে আস্তে অন্য কারও হয়ে যাচ্ছে, তখন এই বুকটার ভেতরটা কেমন পুড়ে ছাই হয়ে যায় জানো? রোজ রাতে তুমি কার মেসেজ দেখে লুকিয়ে হাসো, সুব্রত? কোন অর্ণব বা অরিন্দম নয়… অন্য কেউ! যাকে আড়ালে রাখো!
সুব্রত: তুমি আমাকে কাঠগড়ায় তুলছ? অথচ গত তিন দিন ধরে আমি জানি তুমি কার জন্য লুকিয়ে কান্নাকাটি করছ! কার কথা ভেবে রাতের পর রাত ছটফট করো!
অপর্ণা: (কেঁপে উঠে) কি… কী বলছ তুমি এসব? কার সঙ্গে কথা বলছি আমি?কার কথা ভাবছি?
সুব্রত: আমিও তো অন্ধ নই, অপর্ণা! তোমার ডায়েরির পাতাগুলো আমি দেখেছি! সেখানে একটা নাম বারবার ঘুরেফিরে আসে। বিয়ের আগে যার সঙ্গে তোমার…
অপর্ণা: (চিৎকার করে ওঠে) থামো! সুব্রত, এক পা এগোবে না! তুমি আমাকে এত নিচে নামালে? আমার অতীতকে টেনে এনে আমার বর্তমানটাকে নোংরা করতে তোমার একটুও বাঁধল না?
সুব্রত: আর তুমি যখন আমাকে প্রতি মুহূর্তে সন্দেহ করো, আমার প্রতিটা পদক্ষেপে অদৃশ্য কারও ছায়া খোঁজো, তখন তোমার বাঁধে না? আমরা দুজনেই আজ পচে যাচ্ছি, অপর্ণা! সন্দেহের ঘুণপোকা আমাদের ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে!
দৃশ্য ৫
(বাইরে হঠাৎ প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। জানালার কাঁচগুলো কাঁপতে থাকে। ঘরের মধ্যে জমাট বাঁধা অন্ধকার ও দমবন্ধ করা নীরবতা। টেবিলে রাখা অপর্ণার ডায়রিটি অসাবধানতাবশত মেঝেতে পড়ে যায় এবং একটা ফোল্ড করা কাগজ পাতা থেকে খসে বেরিয়ে আসে। সুব্রত কুড়িয়ে নিতে গিয়ে কাগজটার ওপর চোখ বুলিয়ে থমকে যায়।)
সুব্রত: (কাঁপাগলায়) এটা… এটা কী? হসপিটালের স্টিমেট? আর এই প্রেসক্রিপশনটা কার? ডাক্তার সেন… ইনি তো কার্ডিওলজিস্ট!
অপর্ণা: (ছিনিয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে হঠাৎ ভেঙে পড়ে) দাও… ওটা আমাকে দাও! হ্যাঁ, ওটা আমার বাবার হার্টের চিকিৎসার এস্টিমেট! গত এক মাস ধরে তিল তিল করে টাকা জোগাড় করছি। কাউকে বলতে পারিনি… কারণ তোমার স্কুল আর সংসার সামলে তোমার ওপর এই অতিরিক্ত মানসিক চাপ দেওয়ার সাহস আমার ছিল না! তাই প্রতিদিন রাতে ওই ডাক্তারের সঙ্গে লুকিয়ে ফোনে কথা বলতাম, হসপিটালের ফাইলপত্র নিয়ে দৌড়াতাম!
সুব্রত: (পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে) আর আমি ভেবেছিলাম… আমি ভেবেছিলাম…
অপর্ণা: হ্যাঁ, তুমি ভেবেছিলে অন্য কিছু! অরিন্দম বা অন্য কেউ যা কানে তুলেছিল, তুমি সেটাই বিশ্বাস করেছিলে! নিজের ছায়াকেই তোমার পর মনে হয়েছিল!
সুব্রত: (নিজের মাথা চেপে ধরে, কান্নায় ভেঙে পড়ার উপক্রম) আর তুমি? তুমি কী ভেবেছিলে? ওই অচেনা নম্বরগুলো কার ছিল?
অপর্ণা: ওগুলো লোন ডিপার্টমেন্ট আর হসপিটালের ব্লাড ব্যাঙ্কের নম্বর ছিল, সুব্রত! তোমার অবর্তমানে ওই নম্বরগুলোই আমার একমাত্র ভরসা ছিল। কিন্তু তুমি কখনো জানতে চাওনি… তুমি শুধু দূরত্ব তৈরি করেছ!
(দুজনের দীর্ঘ, ভারী নীরবতা। বাইরে ঝড়ের গর্জন। সেই ঝড়ের শব্দ যেন তাদের বুকের ভেতরের জমে থাকা সমস্ত পাথর ধুয়ে মুছে ফেলতে চায়।)
দৃশ্য ৬
(ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছোট্ট তুলি ভয়ে ভয়ে দরজা ফাঁক করে তাকায়।)
তুলি :– (নেপথ্যে, ভয়ে কাঁপাকাপা গলায়): বাবা… মা… তোমরা এত চিৎকার করছ কেন? আমাদের বাড়িটা কি ভেঙে পড়ছে?
(সুব্রত ও অপর্ণা চমকে ওঠে। ঝড়ের শব্দের মধ্যে সন্তানের এই ভয় তাদের দুজনকে এক নিমেষে বর্তমানের নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সুব্রত এগিয়ে গিয়ে তুলিকে জড়িয়ে ধরে, আর অপর্ণা এসে তাদের দুজনকে বাহুডোরে ঢেকে নেয়।)
সুব্রত: (গলার স্বর ভারী) না মা… বাড়ি ভাঙছে না। একটু ধুলো জমেছিল তো, ঝড় এসে সেই ধুলো উড়িয়ে পরিষ্কার করে দিয়ে গেল।
অপর্ণা: (চোখের জল মুছতে মুছতে সুব্রতের কাঁধে হাত রাখে) আমরা একটু বোকামি করেছিলাম রে সোনা। কিন্তু এখন আর ভুল হবে না।
তুলি: আর কখনো আলাদা ঘরে থাকবে না তো?
সুব্রত ও অপর্ণা একসঙ্গে: (এক অদৃশ্য বোঝাপড়ার শান্ত হাসিতে) না। আর কখনো না।
(বাইরে বৃষ্টির শব্দ ক্রমশ কমে আসে। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর একরাশ পরিচ্ছন্ন প্রশান্তি চারপাশ ঘিরে ধরে।)
সমাপ্ত