কবিতা স্ত্রীর পত্র
কবি প্রতাপ মণ্ডল
কাব্যগ্রন্থ অপ্রকাশিত
সময় (জানুয়ারি ২০২৩, সন্ধ্যে )
উৎসর্গ সন্ধ্যা মণ্ডল
লিখার স্থান ব্যারাকপুর
সম্পৃক্ততা প্রেম
কবিতার বিষয় প্রেম
Review This Poem

স্ত্রীর পত্র
****-***************

প্ৰিয় —

হয়তো ‘প্ৰিয়’ শব্দটা দেখেই তোমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো! কি করবো বলো! প্রিয়তোষ নামটা ছোট করে আমি তোমাকে প্রিয় করে নিয়েছিলাম। আর তাছাড়া তুমি তো আমার প্ৰিয় ছিলে, আজও সেই প্রিয় রয়ে গেছো। মনের কুঠুরি তে যে তোমার বাস, তাইতো তুমি আজও অপ্রিয় হতে পারো নি আমার কাছে।

তোমাকে হোয়াটস্যাপ এ লিখতেই পারতাম এ চিঠি। কিন্তু মনে হলো, আজ সাদা কাগজে কিছু কথা লিখি। তোমার মতো আমিতো আর কবিতা লিখতে পারিনা, তাই মনের কথা চিঠিতেই লিখলাম। যদি মনে হয় এ চিঠি অপ্রয়োজনীয়, তবে আর পড়ো না। ছিঁড়ে ফেলো বা আগুনে পুড়িয়ে দিও। আমিতো আর দেখতে যাবো না!

আচ্ছা, আমাদের ডিভোর্স টা কি খুব প্রয়োজন ছিলো? তুমি যখন যেটা চেয়েছো সেটাই করেছো, আমিতো কখনো তোমাকে বাধা দিইনি! কতটা ভালোবেসেছো, আজ আমাকে সত্যি করে বলবে? যদি সত্যি ভালোবাসতে তবে কি এভাবে উপড়ে ফেলতে পারতে তোমার জীবন থেকে? হ্যাঁ, তুমি আমাকে উপড়ে দিয়েছো। আমি আজও বেঁচে আছি সে ঠিক, কিন্তু এ বাঁচা যে মরার সমান। শুধু এ দেহের মরণ হয়নি তোমার সন্তানের জন্য। তাকে যে মানুষ করতে হবে। পৃথিবীর সব মা চায়, তার সন্তান ভালো থাকুক। পৃথিবীর সব প্রেমিকা চায়, তার ভালোবাসার মানুষটা ভালো থাকুক। আমিও তাই চেয়েছি, আমিও তাই চেয়েছিলাম, আমি আজও তাই চাই।

যেদিন আমাদের আইনি বন্ধন সব শেষ হলো, তারপর একদিন ও বাড়ি আমি গিয়েছিলাম। আমার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনতে। সেই শেষবার, তারপর আর দেখা হয়নি তোমার সাথে। ভাগ্যের সন্ধানে ছেলেকে নিয়ে আমি পারি দিলাম সুদূর মুম্বাই। হ্যাঁ, আজ আমি প্রতিষ্ঠিত, ছেলেকে নামী স্কুলে ভর্তি করেছি। একটা এক কামরার ফ্ল্যাট কিনেছি জানো! ও বাড়ির মতোই দক্ষিণে একটা জানলা আছে। তুমি যখন ঘুমিয়ে পড়তে, আমি জানলার ধারে এসে দাঁড়াতাম। ওই আকাশটা আমার বরাবরের প্ৰিয় ছিলো। রাতের আকাশের একটা আলাদা রূপ আছে। ধ্রুবতারা ধীরে ধীরে স্থান পরিবর্তন করে শুকতারায় পরিণত হতো। কত রাত আমি ঘুমাই নি। কি করে ঘুমাবো বলো? কাছের মানুষটা এতো কাছে থেকেও কত পর!

কি হতো! পাঁচ কামরার একটা ঘরে আমি পড়ে থাকতাম! অন্ততঃ তোমার হাতের কাছে জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে দিতে পারতাম! সে সুযোগটুকু তুমি কেমন কেড়ে নিলে! সন্তান কি আমার একার? সে কি তোমার সন্তান নয়? কই, কোনোদিনই তো জানতে চাও নি তোমার সন্তানের কথা! কোনোদিন তো জানতে চাওনি আমাদের কথা! কি এমন অপরাধ ছিলো আমাদের? আমি সেকেলে? আমি আধুনিকা হতে পারিনি? তুমিও তো তোমার মনের মতো গড়ে নিতে পারতে আমায়? কি পেয়েছি তোমার কাছে আমি? হ্যাঁ পেয়েছি, শুধু অবহেলা।

আমি খুব ভালো আছি জানো! এখনো তেমনই রাতের আকাশ দেখি, দেখি তারা খসা, দেখি ধ্রুবতারার স্থান পরিবর্তন আর দেখি আলসে চাঁদটা ধীরে ধীরে অস্ত যায়! কখনো দেখি মেঘের ঘনঘটা, বৃষ্টি এসে আমাকে ভিজিয়ে দেয় — মনে হয় তোমার বাহুতে ধরা দিয়ে তোমার হিম শীতল স্পর্শ অনুভব করছি। উষ্ণ পরশ তো কখনো দাও নি, তোমার শীতল স্পর্শেই আমি খুব সুখী ছিলাম।
আমি আজও খুব সুখী জানো! তোমাকে আজও তেমন করেই বুকে ধরে রাখতে পেরেছি। আমি চাইলেই কোনো পুরুষের বাহুলগ্না হতে পারতাম, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে কি কৈফিয়ত দিতাম? তাইতো তুমি উপড়ে ফেললেও আমি পারিনি তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে।

তবে হ্যাঁ, ভেবো না তোমার কাছে আমি আবার ফিরে যাবো! ভেবে নিও না যেন, ইনিয়ে-বিনিয়ে তোমাকে বলতে চাইছি, তুমি ডাকলেই আমি ছুট্টে গিয়ে তোমার বাহুপাশে ধরা দেবো! আসলে কি জানো! দূরত্ব বুঝিয়ে দেয়, মানুষটা কত প্ৰিয়। তুমি আজকাল এতো বিরহের কবিতা লেখো কেনো? তুমিতো বন্ধনহীন হয়ে থাকতে চেয়েছিলে! তুমিতো আজ বন্ধনহীন। তবে কেনো বিরহের কথা লেখো?

যাই লেখো, তোমার লেখা যেন কখনো থামিও না। আমিতো জানি, তুমি যেদিন লিখতে পারবে না সেদিন তুমি আর বাঁচতে চাইবে না। ভাবছো তো? আমি কি করে জানলাম এতো কথা? অলক্ষ্যে থেকেও আমি যে তোমায় দেখতে পাই। এই যে এখন, এই চিঠি পড়তে পড়তে তোমার দু’চোখ ঝাপসা! কি দেখতে পাই তো? আমি যে তোমায় ভালোবাসি গো, খুউব ভালোবাসি………

ইতি ——-
তোমার __________

কলমে —— প্রতাপ মণ্ডল

guest
0 Comments
Newest
Oldest Most Voted