কবিতা শুধু শব্দের পতন—
কবি নাইমুর রহমান
কাব্যগ্রন্থ তুমি_আমি_আর_বিচ্ছেদের_ সন্ধ্যা
সময় ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাত ০৯:০৬ PM
উৎসর্গ অচেনা সম্পর্কের সারথি।
লিখার স্থান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, এফ ব্লক
সম্পৃক্ততা নীরবতা, বিচ্ছেদ ও কষ্ট থেকে শান্তির খোঁজ।
Review This Poem

শুধু শব্দের পতন—

কখনো কখনো

মানুষ ভাঙে না—

শুধু তার ভেতর থেকে,

কিছু শব্দ চুপচাপ নিচে পড়ে যায়।

কেউ শুনতে পায় না।

শুধু বুকের গভীরে

একটা অদৃশ্য শব্দ হয়—

যেন বহুদিনের পুরোনো কোনো বাড়ি

নিজের ভেতরেই ধসে পড়ল।

আমি সেই শব্দ শুনেছি।

শুনেছি—

“ভালো আছি” বলার পর

কণ্ঠের ভেতর কীভাবে

একটা দীর্ঘশ্বাস মরে যায়।

শুনেছি—

বিদায় বলার সময়

ঠোঁটের কাছে এসে থেমে যাওয়া

হাজারটা কথা

কীভাবে ফিরে যায় হৃদয়ের অন্ধকার ঘরে।

কেউ জানে না,

একজন মানুষ কতটা কষ্ট পেলে

কথা বলা বন্ধ করে দেয়।

কতটা একা হলে

নিজের সঙ্গেই কথা বলে।

কতবার হারালে

হারানোর হিসাব রাখাও

একসময় বন্ধ হয়ে যায়।

আমিও একদিন

আমার সমস্ত কষ্টকে

শব্দে লিখতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু কলম ধরতেই দেখলাম—

কিছু ব্যথার কোনো ভাষা নেই।

তারা শুধু বুকের মধ্যে

পাথরের মতো পড়ে থাকে।

দিন যায়,

রাত যায়,

মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়—

কিন্তু সেই পাথরগুলো

একটু একটু করে

পাহাড় হয়ে ওঠে।

আমি সেই পাহাড়ের নিচে

বহুদিন বসে ছিলাম।

কাউকে ডাকিনি।

কারণ বুঝে গিয়েছিলাম,
সব কান্নার জন্য
—
কোনো শ্রোতা থাকে না।
সব গল্পের জন্য
—
কোনো পাঠক থাকে না।
আর সব ভালোবাসার
—
কোনো শেষ ঠিকানা থাকে না।

তাই একদিন

আমি আমার কষ্টকে বললাম—
“থাক”।
তুই থাক আমার সঙ্গে।

তোকে আর সরিয়ে দিতে চাই না।

অদ্ভুতভাবে
—
সেদিনই বুকটা একটু হালকা হলো।

কারণ এতদিন

আমি কষ্টের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলাম।

সেদিন প্রথমবার

তার পাশে বসেছিলাম।

তারপর দেখলাম—

কষ্টও ক্লান্ত।

তারও তো
-কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

সে-ও শুধু

আমার বুকের ভেতর

একটা আশ্রয় খুঁজছিল।

তখন বুঝলাম—

শান্তি মানে কষ্টহীন জীবন নয়।

শান্তি মানে কষ্টকে
 আর নিজের শত্রু মনে না করা।

যে মানুষ চলে গেছে,

তাকে ফিরে পাওয়া শান্তি নয়।

যে কথা বলা হয়নি,

তার উত্তর পাওয়াও শান্তি নয়।

যে স্মৃতি প্রতিদিন কাঁদায়,

তা মুছে ফেলাও শান্তি নয়।

শান্তি হলো—
একদিন সেই স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে

চোখে জল নিয়ে বলতে পারা,
“তুমি আমাকে ভেঙেছিলে,

কিন্তু তুমি আমাকে শেষ করতে পারোনি।”

শান্তি হলো—
পুরোনো দরজাটা আর না খোলা,

যদিও ওপাশে এখনো

পরিচিত কোনো কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

শান্তি হলো—
কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া,

যদিও সে কখনো
 ক্ষমা চায়নি।

নিজেকেও ক্ষমা করা—
সেইসব ভুলের জন্য,

যেগুলো করার সময়
 আমরা জানতাম না
 সেগুলো ভুল ছিল।

আজকাল তাই

আমি আর শব্দ খুঁজি না।

শব্দেরও তো পতন আছে।

কিছু শব্দ ঠোঁট থেকে পড়ে যায়,

কিছু চোখ থেকে,

কিছু চিঠির পাতায়,

আর কিছু—
সরাসরি হৃদয়ের গভীরে।

যে শব্দগুলো সেখানে পড়ে যায়,

তাদের আর কেউ কুড়িয়ে নেয় না।

তারা ধীরে ধীরে

নীরবতা হয়ে যায়।

আর সেই নীরবতার মধ্যেই

একদিন মানুষ
 নিজেকে খুঁজে পায়।

আমি পেয়েছি।

অনেক কান্নার শেষে,

অনেক হারানোর পরে,

অনেক রাত জেগে—
আমি আমার ভাঙা বুকের ভেতর

একটুখানি শান্তি পেয়েছি।

এখন আর কাউকে বলি না—

“আমাকে বুঝো।”

শুধু নিজের বুকের ওপর

হাত রেখে বলি—
“আমি তোমাকে বুঝি।”

এই কথাটুকুই

হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

কারণ শেষ পর্যন্ত
,
সবাই চলে যায়।
সব শব্দ থেমে যায়।
সব গল্পের আলো নিভে আসে।

শুধু মানুষটি থেকে যায়—

নিজের ভেতরের ধ্বংসস্তূপের পাশে
,
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে।

তারপর খুব ধীরে

সে নিজের ভাঙা অংশগুলো কুড়িয়ে নেয়।

কোনো শব্দ করে না।
কোনো অভিযোগ করে না।
শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে

একবার গভীর শ্বাস নেয়—
আর বুঝতে পারে,
সব পতন ধ্বংসের জন্য নয়।

কিছু পতন মানুষকে
 তার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে।

তাই আজ—
যে শব্দগুলো হারিয়ে গেছে,

তাদের আর ডাকব না।
যে মানুষগুলো চলে গেছে,

তাদের আর ফিরতে বলব না।
যে ব্যথাগুলো রয়ে গেছে,

তাদেরও তাড়াব না।

আমি শুধু বসে থাকব—

আমার নীরবতার পাশে,
আমার সমস্ত অসমাপ্তির পাশে,
আমার বুকের ভেতর
 ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসা

সেই পাহাড়টার পাশে।

কারণ এখন জানি—

কখনো কখনো

সবচেয়ে গভীর শান্তি আসে

কোনো শব্দের পরে নয়—
শুধু শব্দের পতনের পরে।

(নাইমুর রহমান)
কল্পনার জগতের গল্পকার—

guest
0 Comments
Newest
Oldest Most Voted